২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, রাত ১২টার ঠিক পরেই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নরম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। চারপাশে ফুলের সমুদ্র এবং নীরব শ্রদ্ধার আবেশে ভরা এক আবেগঘন পরিবেশ। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়—একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এবারের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
ঠিক ১২টায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তার উপস্থিতি ভাষা আন্দোলনের সেই সব বীর শহীদদের স্মরণ করিয়ে দিল, যারা ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মাত্র ১২ মিনিট পর, ১২টা ১২ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। নোবেল পুরস্কারজয়ী এই বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ আলপনা আর মোমবাতির আলোয় সাজানো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান, যা অনুষ্ঠানটিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
কিন্তু শ্রদ্ধাঞ্জলি সেখানেই শেষ হয়নি। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পর একের পর এক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রধান বিচারপতি, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধানরা—সবাই একে একে এসে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শহীদ মিনার, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের প্রতীক, নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল এই আবেগময় মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষার শক্তি এবং তা রক্ষায় আত্মত্যাগের গল্প। একুশের প্রথম প্রহর কেবল একটি রীতি নয়; এটি ভাষাশহীদদের প্রতি এক হৃদয়গ্রাহী শ্রদ্ধাঞ্জলি, যাদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
রাত যত গভীর হতে থাকে, শহীদ মিনার চত্বরে বাজতে থাকে একুশের অমর গান *আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি*। হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার। ভোরের আলোয় স্নাত এই স্মৃতিসৌধ যেন ভাষা আন্দোলনের অমর কাহিনীকে আবারও জীবন্ত করে তোলে, নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অনুপ্রাণিত করে।
এই বছরের একুশে পালন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি শক্তিশালী অনুস্মারক, যা আমাদের জাতীয় identity গঠনের সেই সব আত্মত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আগামী প্রজন্মের কাছে একুশের চেতনা বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানায়।
আমাদের সোশ্যাল প্লাটফর্ম জয়েন করুন